ক্রীড়া • সংস্কৃতি • সমাজ • একসূত্রে

ইতিহাস

ইতিহাস — বড়িশা তরুণ তীর্থের দুর্গাপূজা।

অকালবোধন থেকে থিমবিপ্লব….!

ক্লাবে দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল ১৯৮৩-র আশ্বিনে। প্রায় ৫ বছর রমরমিয়ে মহাকালীর অর্চনায় নিয়োজিত থাকার পর ১৯৮৩ তে অকালবোধনে উদ্যোগী হয় ক্লাব কর্তৃপক্ষ। সভাপতির পদ অলংকৃত করেন, শ্রী বীরেশ্বর রায়চৌধুরী। সম্পাদক : শ্রী দিলীপ ঘোষ আর কোষাধ্যক্ষের ভূমিকা পালন করেন, শ্রী প্রভাকর কর মহাশয়। সেবছর ক্লাবসংলগ্ন ছোট মাঠেই সপরিবারে হৈমবতীর আবির্ভাব ঘটে সাবেকি প্যাণ্ডেলে। আড়ম্বরের আতিশয্যে নয়, অন্তরের ভক্তিকে পাথেয় করেই শুরু হয় পথ চলা। তখন দুর্গাপুজো বলতে আধ কিলোমিটার দূরবর্তী পঞ্চাননতলায় সকলকে হত যেতে। ক্লাবের এই উদ্যোগ সেই দূরকে আরও কাছে নিয়ে আসে। তারপর থেকে প্রতিবছর শারদবন্দনায় ব্রতী হয়ে ওঠে ক্লাব। তবে সদস্যদের মনে থিমপুজোর জোয়ার আসে ২০০৫ সালের আশেপাশে। ততদিনে ক্লাবের অনতিদূরের বড়মাঠে শুরু হয়েছে পূজার আয়োজন। অপটু হাতে প্রথম রবীন্দ্রসদনের আদলে প্যাণ্ডেল গড়ে ওঠে। তারপরের বছর পরিস্থিতি হয় আরও দূর্বিসহ। উন্মুক্ত থিয়েটারের স্টেজে মা'কে বসাতে গিয়ে নাজেহাল পরিস্থিতি। সদস্যদের শিল্পপ্রতিভা প্রবল ঝড় আর দাপুটে বৃষ্টিতে প্রায় সব যায় তছনছ হয়ে। বড় পলিথিন আর ত্রিপলের আড়ালে সপরিবারে দেবী রক্ষা পান কোনোক্রমে। তা থেকে শিক্ষা নিয়ে এরপর বিষয়ভাবনায় পরিবর্তন আসে। ঠিক হয়, আর সদস্যদের শিল্পপ্রচেষ্টায় ভরসা না রেখে একজন শিল্পীকে দিয়েই শারদভাবনার রূপায়ণ ঘটাতে হবে দৃঢ়ভাবে। শিল্পী এল বটে, ডাক নাম টিটু। কিন্তু অ্যাটিটিউড্ আজকের ভবতোষ সুতারকেও ভয় ধরাবে। তার ভাবনায় গতবছরের বিপর্যস্ত প্যাণ্ডেলের প্লাইউড কেটে শুরু হল একের পর এক বুক সেল্ফের থাক তৈরির কাজ। তার শিল্পদগ্ধ চোখের গভীর ভাবনা দেখে মনে হয়, মাইকেলএঞ্জেলো ভর করেছে তার উপরে। এত বুক সেল্ফ কী হবে তাই নিয়ে আমরাও অবাক! প্রশ্ন করলেও উত্তর আসে না তার দিক থেকে। ভাবনার গভীর স্তর থেকে সে যখন জেগে ওঠে, তখনই কানে গোঁজা পেন্সিল আঁকিবুঁকি কাটতে থাকে খাতার উপরে। এবার শুরু হল প্লাই দিয়ে বই তৈরির কাজ। সে এক দূর্বিষহ শিল্পবিপর্যয় বটে। দেখে আমাদের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। চৌকো প্যাণ্ডের তিনদিক জুড়ে লাগানো হয়েছে একের পরবএক বুক সেল্ফ। মহালয়া আগত। মা এসে গেছেন কুমোরটুলি থেকে। কিন্তু বসবেন কোথায়! পুরোটাই তো নকল বই আর বুকসেল্ফে আছে ভরে। পরদিন থেকেই শিল্পী টিটু গেল হাওয়া হয়ে। সকলের হাত কপালে ঠেকল এসে। শিল্প পরিস্থিতি সামলাতে চার সদস্য এগিয়ে এল বাধ্য হয়ে। তাদের মধ্যে অন্যতম তুহিন ভট্টাচার্য্য, পার্থ হালদার আর ঋত্বিক দে। রাতারাতি চিত্রশিল্পী জোগাড় কী চারটিখানি কথা। সেই হাসির খোরাক হওয়া বিধ্বস্ত পরিকাঠামোর রূপ বদলে এবার সকলে ঝাঁপিয়ে পড়ল কাঁধে কাঁধ দিয়ে। আর্থিক পরিস্থিতিও ভালো নয়, যে রাতারাতি সব বদলানো যাবে। তাই মান বাঁচাতে তুহিনবাবুর পরিকল্পনায় দুর্গারবহাতের ত্রিশূল সরিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হল একটা বিশাল ফাউন্টেন পেনের কার্টআউট। তিনিই নাম দিলেন অশিক্ষার অন্ধকার দূর করতে এবারে কলম দিয়ে দেবী যেহেতু বধ করছেন অসূরকে। তাই অশিক্ষার এই অসুর নিধনের নাম হোক, -- "কলম বিঁধে কুপোকাত"।

দুর্দান্ত জনপ্রিয়তা এল সে বছরে। মণ্ডপের প্রধান ফটকের সামনেই উন্মুক্ত একটি 'শ্রীচণ্ডী'। তার উপর গ্লোব ঘুরছে ক্লাব সদস্য তিমির হাজরা মহাশয়ের ভাবনার দৌলতে। চণ্ডীর বামদিকের পাতার পাশ দিয়ে মণ্ডপে প্রবেশ করলেই দেওয়াল জুড়ে চিত্রিত শিক্ষার বিবর্তন। নালন্দা থেকে শুরু হয়ে রকেট সায়েন্সে থেমেছে গিয়ে ডানদিকে। ভিড় হবে না মানে। পরিস্থিতি না চাইলেও লাইনদিয়ে ক্লাবের দুর্গাপূজার প্যাণ্ডেলে দর্শকদের অনুপ্রবেশ সেই প্রথম।

পরের বছর আর এক স্থানীয় শিল্পীর হাতে আমাদের শারদভাবনায় "১২মাসে ১৩ পার্বনের কথা" উঠে আসে। শারদভাবনার যাত্রাপথ ক্রমে পোক্ত হতে থাকে। তার সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটে 'শিল্পীমন'-এর শিল্পভাবনায় ২০০৯এর প্যাণ্ডলে। সেই প্রথম সত্যিকারের থিমের পুজো শুরু হয় ক্লাবের ব্যানারেতে।