এ পর্যন্ত যাত্রা…!
১৯৭১। নকশাল বাড়ি আন্দোলনের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে সারা কলকাতা ও তার শহরতলি জুড়ে। জলাজঙ্গলে পরিপূর্ণ পূর্ব বড়িশার এই প্রত্যন্ত অঞ্চল। সাবেক কলকাতার ক্ষয়িষ্ণু জমিদার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের লেঠেল, গোয়ালা আর কয়েক ঘর কুলপুরোহিতের বংশধরেরা এঅঞ্চলে তাদের বসত তুলেছে গড়ে। রাতের বাতাসে বারুদের গন্ধ। পুলিশের ভারি বুটের শব্দ শোনা যায় মাঝরাতে। হুইশেলের শব্দ কানে আসতেই সতর্ক গৃহস্থ্যের সজাগ চোখ ঘর অন্ধকার করে জানলা দিয়ে খুব সাবধানে উঁকি মারে। মুহূর্তে গুলির শব্দ। দূরে একটা অস্ফুট আর্তনাদ। সজোরে জানলার পাল্লা যায় বন্ধ হয়ে। এমনই এক পরিস্থিতিতে মুরাদপুর পল্লীর কিছু যুবক সংগঠিত হয়, একটা সংঘ গড়ার অভিপ্রায় নিয়ে। উদ্দেশ্য, শরীর চর্চা, সামাজিক ভীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা। ফলে গড়ে ওঠে 'আমরা ক'জনে'র ভিত্তিভূমি। মনমালিন্য আর মতপার্থক্যের জেরে আজকের এই ঠিকানাতেই দরমা আর টালির চালের ছোট্ট ক্লাবঘর। তারুণ্যের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে ক্লাবের নাম হয় বড়িশা তরুণ তীর্থ। ভলিবল আর বক্সিং কে পাথেয় করে এলাকার যুবকদের খেলাধূলা আর শরীরচর্চার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে এই ক্লাব। পাশাপাশি আমরা ক'জন, জাগৃহী, মৈত্রী সংঘের সুবিশাল মাঠের সবুজ ঘাসে ষখন গড়াচ্ছে ফুটবল, তখন জগা ঘোষের বক্সিং এর পাঞ্চ মুরাদপুরের এ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এশিয়াডে গেছে চলে। ক্রমে বর্ধিষ্ণু হয়ে উঠতে থাকে এ অঞ্চল। সময়ের নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে নিজেকে মেলে ধরতে চেষ্টা করে নতুন করে। ১৯৭৫ এর ১০ ই মার্চ, গড়ে ওঠে ক্লাবের সংবিধান। ১৭ টি বলিষ্ঠ হাতের অঙ্গীকার ভাষা পায় তাতে। তাদের মধ্যে অন্যতম --
- সভাপতি : সর্বশ্রী রামচন্দ্র দাস।
- চারজন সহ-সভাপতি : সুশীল চন্দ্র ঘোষ, নিধিরাম জানা, পরেশ চন্দ্র সাঁপুই ও নন্দগোপাল ভট্টাচার্য্য।
- সম্পাদক : ঠাকুরদাস ঘোষ।
- দু'জন সহ-সম্পাদক : তাপস ঘোষ ও নারায়ণ বণিক।
- কোষাধ্যক্ষ : শঙ্কর কুমার ঘোষ।
আর কার্য্যকরী সদস্যের পদাভিসিক্ত হন -- বাসুদেব ঘোষ, রমাপ্রসাদ দত্ত, দিলীপ ঘোষ, অসীম কুমার ঘোষ, দিলীপ কুমার ঘোষ ও অসিত কুমার ঘোষ প্রমুখেরা। ক্লাবের সাংবিধানিক যাত্রা শুরু সেই থেকে।
ভূত চতুর্দশীর ভূতেদের উৎপাত বিদূরিত হয় '৭৭ এ। শুরু হয় কালীপূজা। রামচন্দ্র দাসের পরিকল্পনায় তরুণদের তীর্থভাূমিতে মায়ের আরতির সেই পঞ্চপ্রদীপই ক্লাবের প্রতীক হয়ে উঠল সেই থেকে। এই শ্যামঙ্গী মাতৃবন্দনা শারদ চিন্তণের প্রাবল্যে তার কৌলিন্য হারালেও আভিজাত্যের রেশ নিয়ে আজও রয়েছে অমলিন হয়ে।
ইতিমধ্যে সকল সদস্যদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলার চরৈবতির মন্ত্র পাথেয় করে ক্লাবঘর পরিবর্ধিত হয়েছে আগের থেকে।
সেদিনের তারুণ্যের স্বপ্ন এযুগের তরুণদের পথ দেখাচ্ছে সামনের দিকে।
সেসব তরুণদের মধ্যে অনেকেই আজ আর নেই। অনেকেই বার্ধক্যে উপনীত। আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে দিয়ে সেদিনের বিন্দুকে আজকের সিন্ধুর তীরে উপনীত করাই আমাদের অভিপ্রায়।